পর্ষদ পুনর্গঠিত ১২ ব্যাংকের হিসাব ছাড়াই খেলাপি ঋণ প্রায় সাড়ে ৩ লাখ কোটি টাকা

ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের ১২টি বেসরকারি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। অনিয়ম-দুর্নীতিতে বিপর্যস্ত ওই ব্যাংকগুলোয় এখন দেশী-বিদেশী অডিট ফার্ম দিয়ে নিরীক্ষা চলছে।

ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের ১২টি বেসরকারি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। অনিয়ম-দুর্নীতিতে বিপর্যস্ত ওই ব্যাংকগুলোয় এখন দেশী-বিদেশী অডিট ফার্ম দিয়ে নিরীক্ষা চলছে। এতে বের হয়ে আসছে হাজার হাজার কোটি টাকার বেনামি ঋণ। কিস্তি পরিশোধ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এরই মধ্যে অনেক ঋণই খেলাপির খাতায় উঠতে শুরু করেছে। তবে পর্ষদ পুনর্গঠিত হওয়া ব্যাংকগুলোর নতুন খেলাপি ছাড়াই গত ডিসেম্বর শেষে দেশের ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৪৫ হাজার ৭৬৪ কোটি টাকা। ওই সময় পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণের ২০ দশমিক ২০ শতাংশই খেলাপির খাতায় উঠেছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে গতকাল জানানো হয়।

প্রতি ত্রৈমাসিকে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের তথ্য প্রকাশ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত ডিসেম্বর প্রান্তিকের খেলাপি ঋণের তথ্য প্রকাশ উপলক্ষে গতকাল কেন্দ্রীয় ব্যাংকে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সেখানে গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ পরিস্থিতি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘২০২৩ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার দেখানো হয়েছিল ৯ শতাংশ। সেটি বেড়ে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ২০ শতাংশ হয়েছে। আগামীতে খেলাপি ঋণ আরো ৯ শতাংশের বেশি বাড়বে বলেই আমার ধারণা।’ আগে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ কম দেখানো হতো বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

আহসান এইচ মনসুর গত বছরের আগস্টে দায়িত্ব নেয়ার পর দেশের ১২টি বেসরকারি ব্যাংকের পর্ষদ ভেঙে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকার সময়ে এ ব্যাংকগুলোতে নজিরবিহীন লুটপাট সংঘটিত হয়। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে জানান, ‘পর্ষদ ভেঙে দেয়া ব্যাংকগুলোতে বিশেষ নিরীক্ষা চলছে। এর মধ্যে কোনো কোনো ব্যাংকের ৮০ শতাংশ ঋণও খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। নতুন করে খেলাপি হওয়া অন্তত ১ লাখ কোটি টাকার ঋণ এখনো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবে যুক্ত করা হয়নি। ওই ব্যাংকগুলোর বিশেষ নিরীক্ষা আগামী দুই-তিন মাসের মধ্যে শেষ হবে। নতুন খেলাপি ঋণের হিসাব যুক্ত হলে চলতি বছরের জুন নাগাদ খেলাপির হার ৩০ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে।’

আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘ব্যাংক খাতে টাকা রেখে টাকা ফেরত পাবে না, এটি হবে না। আমরা এটি হতে দেব না। এক্ষেত্রে সরকারেরও কিছু দায়বদ্ধতা রয়েছে। আমরা চাচ্ছি, ব্যাংক খাতকে শক্তিশালী করতে। জনগণের আস্থা ব্যাংক খাতের ওপর ফিরিয়ে আনতে হবে। আমরা দুর্বল ব্যাংকগুলোকে একীভূত করার চেষ্টা করব। এরই মধ্যে ব্যাংক রেজল্যুশন আইন তৈরি হয়ে গেছে। সেটি ভেটিংয়ের জন্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। আর ব্যাংক ডিপোজিট ইন্স্যুরেন্স আইনও পরিবর্তন করা হচ্ছে।’

গভর্নর জানান, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণের স্থিতি ছিল ১৭ লাখ ১১ হাজার ৪০২ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২০ দশমিক ২০ শতাংশ ঋণ খেলাপি হয়ে গেছে। গত সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপির হার ছিল ১৬ দশমিক ৯৩ শতাংশ। গত বছরের সেপ্টেম্বরে খেলাপি হওয়া ঋণের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৮৪ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকা। ডিসেম্বরে এসে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৩ লাখ ৪৫ হাজার ৭৬৪ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। সে হিসাবে গত বছরের শেষ তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৬০ হাজার ৭৮৭ কোটি টাকা।

ডিসেম্বর শেষে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর ৪২ দশমিক ৮৩ শতাংশ ঋণ খেলাপি হয়ে গেছে বলে গভর্নর জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘গত বছরের সেপ্টেম্বরে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হার ছিল ৪০ দশমিক ৩৫ শতাংশ। আর ডিসেম্বর শেষে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হার ১৫ দশমিক ৬০ শতাংশ হয়েছে। সেপ্টেম্বরে এ শ্রেণীর ব্যাংকগুলোর খেলাপির হার ছিল ১১ দশমিক ৮৮ শতাংশ।

আহসান এইচ মনসুর জানান, ব্যাংকগুলোকে মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণের সময় গণনার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড চর্চার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এর প্রভাবে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েছে। দেশের ব্যাংক খাতের স্বার্থে এটি করতেই হতো। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শন বিভাগ থেকে কিছু বড় ঋণগ্রহীতার নেয়া ঋণ খেলাপি করে দেয়া হয়েছে। খেলাপি ঋণের ওপর আদালতের স্থগিতাদেশসংক্রান্ত রিট ভ্যাকেট হয়ে গেছে। পুনঃতফসিলকৃত ঋণের কিস্তি পরিশোধ না হওয়ার কারণেও কিছু ঋণ খেলাপি হয়েছে। এসব কারণে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুন শেষে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ১১ হাজার ৩৯২ কোটি টাকা, যা ছিল ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণের ১২ দশমিক ৫৬ শতাংশ। ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে গত বছরের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয়। প্রধানমন্ত্রীর পদ ছেড়ে ভারত পালিয়ে যান তিনি। সরকার পতনের পর দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নর আবদুর রউফ তালুকদারও পালিয়ে যান। এরপর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর অর্থনীতিবিদ ড. আহসান এইচ মনসুরকে গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেয়।

গতকালের সংবাদ সম্মেলনে গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘এ মুহূর্তে দেশের অর্থনীতির জন্য বড় কোনো সংকট নেই। ব্যালান্স অব পেমেন্টের দিক থেকেও নেই, আবার ব্যাংক খাত থেকেও নেই। কেবল আমানতের প্রবাহ কিছুটা বাড়াতে পারলে ব্যাংক খাতের তারল্য সংকটও কমে যাবে। গত এক-দুই বছরে যে হারে আমানতের প্রবৃদ্ধি হয়েছে, সেটি পর্যাপ্ত নয়। এ মুহূর্তে আমানতের প্রবৃদ্ধি ৭-৮ শতাংশ। একটি স্বাস্থ্যবান অর্থনীতিতে আমানতের প্রবৃদ্ধি ১৪ থেকে ১৮ শতাংশ হওয়া উচিত।’

গভর্নর বলেন, ‘বিপিএম৬ অনুযায়ী আমাদের রিজার্ভ এখন ২১ বিলিয়ন ডলারের বেশি আছে। এটি মোটামুটি স্বস্তিকর একটি অবস্থা। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে রিজার্ভ সংরক্ষণের যে শর্ত দেয়া আছে, সেটি আমরা গত সেপ্টেম্বর ও ডিসেম্বরে অর্জন করতে পেরেছি। আশা করছি, আগামী মার্চ প্রান্তিকেও আমরা শর্ত অনুযায়ী রিজার্ভ রাখতে পারব।’

ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের হার ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত উঠতে পারে বলে এর আগে বেশ কয়েকবারই আহসান এইচ মনসুরের পক্ষ থেকে সতর্কবার্তা এসেছিল। গভর্নর পদে যোগদানের পর তিনি একাধিকবার বলেছেন, ‘দেশের ব্যাংক খাতে গত ১৫ বছর যে পরিমাণ অনিয়ম-দুর্নীতি ও লুণ্ঠন হয়েছে, সেটি পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। বিশ্বের কোথাও একসঙ্গে এত ব্যাংক লুট হয়নি। এস আলম, বেক্সিমকোসহ কিছু গ্রুপ প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকা নিয়ে গেছে।’

খেলাপি ঋণের হার যে ৩০ শতাংশ ছাড়াবে সেটির আভাস দেয়া হয়েছে চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের মুদ্রানীতিতেও। ১০ ফেব্রুয়ারি ঘোষিত মুদ্রানীতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছে, দেশের ব্যাংক খাতের জন্য গুরুতর উদ্বেগের বিষয় হলো খেলাপি ঋণ। এ খেলাপি ঋণের হার ৩০ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে। পদ্ধতিগত দুর্বলতা, নিয়ন্ত্রণগত ঘাটতি ও অর্থ পাচারের মতো অপরাধ তথা শোষণমূলক অনুশীলনকে এজন্য দায়ী করা হয়েছে।

নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ের পর শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি। ওই বছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্তও দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল মাত্র ২২ হাজার ৪৮২ কোটি টাকা। আর শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরের মাস তথা গত বছরের সেপ্টেম্বরে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ২ লাখ ৮৪ হাজার ৯৭৭ টাকায় ঠেকে। এ ঋণের বাইরেও প্রায় ৬৪ হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ অবলোপন করা হয়। আর খেলাপি কম দেখাতে গত কয়েক বছরে বাছবিচার ছাড়াই লাখ লাখ কোটি টাকার ঋণ পুনঃতফসিল ও ঋণ পুনর্গঠন করা হয়। আইএমএফের হিসাবে বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের বিতরণকৃত ঋণের এক-চতুর্থাংশ তথা ৫ লাখ কোটি টাকার বেশি ঋণ আগে থেকেই ‘দুর্দশাগ্রস্ত’।

আরও